ব্ল্যাক হোলে পড়লে আসলে কী হতে পারে?যে রহস্যের উত্তর এখনও পুরোপুরি জানে না বিজ্ঞানও!
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
মহাকাশের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তুগুলোর কথা উঠলে সবার আগে যে নামটি আসে, সেটি হলো ব্ল্যাক হোল। এমন একটি স্থান, যেখানে একবার কিছু প্রবেশ করলে—এমনকি আলোও—আর ফিরে আসতে পারে না। এই কারণেই ব্ল্যাক হোলকে মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে আকর্ষণীয় রহস্য বলা হয়। কিন্তু যদি সত্যিই কোনো মানুষ ব্ল্যাক হোলে পড়ে যায়, তাহলে কী ঘটবে? সে কি মুহূর্তেই মারা যাবে? অন্য কোনো মহাবিশ্বে পৌঁছে যাবে? নাকি সময়ই তার জন্য থেমে যাবে?সত্যি বলতে, আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ ব্ল্যাক হোলে পড়েনি। তাই এর সঠিক উত্তর কারও জানা নেই। তবে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা কিছু সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আর সেই ব্যাখ্যাগুলো বাস্তবের চেয়েও অনেক বেশি বিস্ময়কর।প্রথমেই জানতে হবে ব্ল্যাক হোল আসলে কী। এটি কোনো বিশাল গর্ত নয়। বরং এমন একটি অঞ্চল, যেখানে এত বেশি ভর একটি ক্ষুদ্র স্থানে কেন্দ্রীভূত থাকে যে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ অবিশ্বাস্যভাবে শক্তিশালী হয়ে যায়। এই আকর্ষণ এতটাই প্রবল যে একটি নির্দিষ্ট সীমার ভেতরে ঢুকে গেলে আলোর গতিতেও আর বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।এই সীমাটিকে বলা হয় ইভেন্ট হরাইজন। এটিকে একমুখী দরজা বলা যায়। বাইরে থেকে এর ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব, কিন্তু ভেতর থেকে আর কোনো কিছুই ফিরে আসতে পারে না। তাই কেউ যদি এই সীমা অতিক্রম করে, তাহলে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে তার সব ধরনের যোগাযোগ চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।তবে ব্ল্যাক হোলে পড়ার অভিজ্ঞতা শুরু হয় আরও আগে থেকেই। আপনি যত ব্ল্যাক হোলের কাছে যাবেন, তার মহাকর্ষ ততই শক্তিশালী হবে। কিন্তু এই আকর্ষণ আপনার পুরো শরীরে সমানভাবে কাজ করবে না। যদি আপনি পা আগে দিয়ে ব্ল্যাক হোলের দিকে পড়েন, তাহলে আপনার পায়ের ওপর মাথার তুলনায় অনেক বেশি মহাকর্ষীয় টান পড়বে।এর ফলে আপনার শরীর ধীরে ধীরে লম্বা হতে শুরু করবে। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে মজার একটি নাম দিয়েছেন—স্প্যাগেটিফিকেশন। কারণ আপনার শরীর অনেকটা স্প্যাগেটির মতো টেনে লম্বা হয়ে যাবে। একই সঙ্গে পাশের দিক থেকে চাপে সরু হয়ে আসবে। শেষ পর্যন্ত এই অস্বাভাবিক টান শরীরকে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত করতে পারে।তবে সব ব্ল্যাক হোলে একই ঘটনা একইভাবে ঘটবে না। ছোট ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রে এই টান ইভেন্ট হরাইজনে পৌঁছানোর আগেই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি ব্ল্যাক হোলটি হয় সুপারম্যাসিভ, অর্থাৎ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা বিশাল ব্ল্যাক হোলগুলোর মতো, তাহলে তাত্ত্বিকভাবে আপনি ইভেন্ট হরাইজন পার হওয়ার সময় হয়তো সঙ্গে সঙ্গে কিছুই টের পাবেন না। কারণ সেখানে মহাকর্ষের পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে ধীরে ঘটে।এবার আসা যাক সময়ের রহস্যে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী, যত বেশি মহাকর্ষ, সময় তত ধীরে চলে। অর্থাৎ ব্ল্যাক হোলের খুব কাছাকাছি গেলে আপনার জন্য সময় স্বাভাবিক থাকলেও দূরে থাকা মানুষের কাছে মনে হবে আপনার সময় ধীরে চলছে।ধরুন, আপনার একজন বন্ধু নিরাপদ দূরত্ব থেকে আপনাকে দেখছেন। তার কাছে মনে হবে আপনি ধীরে ধীরে ইভেন্ট হরাইজনের কাছে গিয়ে যেন থেমে গেছেন। আপনার ছবি ক্রমেই ম্লান হয়ে যাবে, লালচে হয়ে যাবে এবং একসময় অদৃশ্য হয়ে যাবে। কিন্তু আপনার নিজের দৃষ্টিতে এমন কিছুই ঘটবে না। আপনি স্বাভাবিকভাবেই সামনে এগিয়ে যেতে থাকবেন।এই বৈপরীত্যই ব্ল্যাক হোলকে এত রহস্যময় করে তুলেছে। একই ঘটনাকে দুইজন পর্যবেক্ষক সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখতে পারেন।ইভেন্ট হরাইজন পার হওয়ার পর কী হয়? এখানেই বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি। কারণ এই সীমার ভেতর থেকে কোনো তথ্যই বাইরে আসে না। ফলে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।একটি ধারণা হলো, আপনি শেষ পর্যন্ত ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রে থাকা সিঙ্গুলারিটি নামের একটি অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাবেন। এখানে পদার্থের ঘনত্ব অসীম হয়ে যায় বলে বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। অর্থাৎ আমরা জানিই না সেখানে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটে।আবার কিছু তাত্ত্বিক পদার্থবিদ মনে করেন, ব্ল্যাক হোল হয়তো অন্য কোথাও যাওয়ার একটি পথ হতে পারে। এই ধারণা থেকেই ওয়ার্মহোল বা মহাকাশের শর্টকাটের ধারণা এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত এর কোনো পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এটি এখনও কল্পনানির্ভর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবেই বিবেচিত।আরেকটি বিখ্যাত রহস্য হলো ব্ল্যাক হোল ইনফরমেশন প্যারাডক্স। যদি কোনো বস্তু ব্ল্যাক হোলে পড়ে সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়, তাহলে সেই বস্তুর তথ্য কোথায় যায়? কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান বলছে, তথ্য সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হওয়া উচিত নয়। এই দ্বন্দ্বের সমাধান খুঁজতে গিয়ে আজও বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন।স্টিফেন হকিং দেখিয়েছিলেন যে ব্ল্যাক হোল সম্পূর্ণ কালো নয়। দীর্ঘ সময় ধরে এটি খুব সামান্য শক্তি বিকিরণ করতে পারে, যাকে হকিং রেডিয়েশন বলা হয়। তাত্ত্বিকভাবে এর ফলে কোটি কোটি বছর পরে ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে বিলীনও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তখন সেই তথ্যের কী হবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অমীমাংসিত।হলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ব্ল্যাক হোলকে ঘিরে মানুষের কল্পনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল। সিনেমাটিতে সময়ের প্রসারণ, বিশাল মহাকর্ষ এবং ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি পরিবেশকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ভিত্তিতে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও নাটকীয়তার কারণে কিছু অংশ কল্পনার আশ্রয় নিয়েছে, তবুও এটি সাধারণ মানুষকে ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে।সবশেষে বলা যায়,ব্ল্যাক হোলে পড়লে আসলে কী হবে—তার নির্ভুল উত্তর এখনও মানবজাতির জানা নেই।আমাদের বর্তমান বিজ্ঞান ইভেন্ট হরাইজন পর্যন্ত অনেক কিছু ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু তার পরের অংশ আজও অজানা। হয়তো সেখানে আমাদের পরিচিত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম ভেঙে যায়। হয়তো সেখানে সময়, স্থান এবং বাস্তবতার ধারণাই সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তাই ব্ল্যাক হোল শুধু একটি মহাজাগতিক বস্তু নয়; এটি আমাদের জ্ঞানের সীমার প্রতীক। যতই আমরা মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানছি, ব্ল্যাক হোল ততই নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। আর হয়তো একদিন, ভবিষ্যতের কোনো নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এই মহাজাগতিক রহস্যের পর্দা সরিয়ে দেবে। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একটাই কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়—ব্ল্যাক হোলে প্রবেশ মানেই এমন এক অজানা যাত্রা, যেখান থেকে ফিরে এসে গল্প বলার সুযোগ আর কারও নেই।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness
OR
This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community