"এক অন্যরকম জার্নির গল্প"

in Incredible Indiayesterday
IMG_20260724_114135.jpg
"ট্রেনে ওঠার পরে বেশ‌ খুশি হয়েছিলেন।"

Hello,

Everyone,

৬৩ বছরে এই প্রথমবার বাড়ি থেকে এতোটা দূরে একা একা গেলেন আমার শাশুড়ি মা। ইতিপূর্বে যে উনি বাড়ি থেকে কোথাও বেরোননি এমনটা নয়, তবে কখনো একা বেরোনো হয়নি। বিয়ের আগে বাবা, মা, দাদাদের মধ্যে থেকে কেউ না কেউ সাথে থাকতো, আর বিয়ের পর আমার শ্বশুরমশাই।

আমি যখন একা বন্ধুদের সাথে দার্জিলিং, সিকিম এই সমস্ত জায়গায় ঘুরতে গিয়েছি, তখন সত্যিই ভাবিনি যে আমার শ্বশুর বাড়ি থেকে আমাকে যাওয়ার পারমিশন দেবে। প্রথম যেবার দীঘায় ঘুরতে গিয়েছিলাম, সেবার অনেকখানি ভয় নিয়ে প্রথমবার শ্বশুর মশাই, শাশুড়ি মা এবং শুভকে বলেছিলাম।

শুভ যেহেতু আমাদের জেনারেশনের ভেবেছিলাম হয়তো ও বারণ করবে না। তবে শ্বশুর মশাই ও শাশুড়ি মাও যে পারমিশন দেবে সত্যিই ভাবিনি। সেই প্রথমবার বেশ অবাক হয়েছিলাম। কারণ ছোটোবেলা থেকে মায়ের কাছ থেকে কখনো বন্ধুদের সাথে ঘুরতে পারমিশন পাইনি। আর সেটা শ্বশুরবাড়ি থেকে পাবো এই বিষয়টা কখনো ভাবিও নি।

IMG_20260724_233544.jpg
"লোকাল ট্রেনে ওঠার পরের ছবি।"

জীবনে প্রথম বন্ধুদের সাথে সেই দীঘাতে যাওয়া। তবে সেই যাত্রা যে কখনো দার্জিলিং বা নর্থ সিকিম পর্যন্ত পৌঁছাবে সত্যিই ভাবিনি। যাইহোক আজ সকালে শাশুড়ি মাকে নিয়ে গিয়েছিলাম শিয়ালদহ স্টেশনে। কারণ উনি শান্তিনিকেতন যাবেন ওনার ননদের বাড়িতে।

শ্বশুর মশাই মারা যাওয়ার পর মানসিক দিক থেকে বেশ বিপর্যস্ত হয়ে আছেন উনি। তাই কখনো বাপের বাড়িতে, কখনো আমার ননদের কাছে, আবার কখনো অন্য কোথাও ঘুরতে যেতে চান বারবার।

৪৩ বছরের সংসার জীবনে কখনো শশুর মশাইকে ছেড়ে কোথাও যাননি। তাই আজ প্রথমবার যাবেন শুনে প্রথমে আমার ননদ এমনকি শুভ পর্যন্ত বারণ করছিলো। সকলে ভাবছিলো একা অতোটা রাস্তা যেতে পারবেন না।

তবে উনি প্রায় জোর করেই সকলকে রাজি করিয়েছেন সেখানে যাওয়ার জন্য। আমি শুধু শিয়ালদহ প্লাটফর্ম থেকে ওনাকে নির্দিষ্ট ট্রেনে বসিয়ে দিয়ে এসেছি। যে প্লাটফর্মে উনি নামবে সেখান থেকে ওনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোক আসবে। তাই চিন্তার কোনো বিষয় ছিলো না। শুধু ট্রেনেই ৪-৫ ঘন্টা একা একা জার্নি করতে হবে এইটুকুই ছিলো সমস্যা।

IMG_20260724_111333.jpg
"শিয়ালদহ স্টেশন পৌঁছে ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।"

খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির কাজ শেষ করে নিয়েছিলাম। শুভর অফিসের রান্না শেষ করার পর, আমি রেডি হয়েছিলাম। তার আগে শাশুড়ি মা নিজের প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু গুছিয়ে নিয়েছিলেন।

বেশ তাড়াহুড়ো করে আমরা ৯.২৫ নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। সকালের দিকে টিকিট কাউন্টারেও বেশ লম্বা লাইন থাকে। যথারীতি দুজনের টিকিট কেটে নিয়ে আমরা ট্রেনে বসলাম।

যেহেতু লোকাল ট্রেন ছিলো, তাই সিট পেয়েছিলাম। সত্যি বলতে সিট পাওয়ার জন্যই একটু তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এই ট্রেনটা ধরেছিলাম। যদিও শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ছিলো ১২.০৯ মিনিটে। কিন্তু আমরা কিছুটা আগে‌ পৌঁছে গিয়েছিলাম।

কারণ পরবর্তী ট্রেনগুলো এতো বেশি ভিড় হবে যে, শাশুড়ি মাকে নিয়ে যাওয়াটা সমস্যার হতো। শুভ নিজের মতো তৈরি হয়ে পড়ে অফিসে বেরিয়ে যাবে এমনটাই কথা ছিলো। ওর টিফিন এবং ব্রেকফাস্ট রেডি করে রেখে আমরা আমাদের মতো বেরিয়ে পড়েছিলাম।

IMG_20260724_111321.jpg
"শাশুড়ি মা কিছু ‌ব্যাগে কিছু ‌গোছাচ্ছিলেন।"

শিয়ালদহ পৌঁছানোর পর বেশ কিছুক্ষণ আমাদের অপেক্ষা করতে হলো ট্রেন কোন প্লাটফর্মে আসবে সেটা দেখার জন্য। ২০ মিনিট মতন অপেক্ষা করার পর, ট্রেন দিয়ে দিলো। আমরাও নির্দিষ্ট প্লাটফর্মে পৌঁছালাম এবং শাশুড়ি মাকে লেডিস কম্পার্টমেন্টেই তুলে দিলাম। ট্রেনটা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই যেহেতু আমরা গিয়েছিলাম, তাই বেশ ভালো সিট পেয়েছিলাম।

IMG_20260724_115125.jpg
"লেডিস কম্পার্টমেন্ট প্রথমে এতোটাই ফাঁকা ছিলো।"

আর লেডিস কম্পার্টমেন্ট একেবারেই ফাঁকা ছিলো। প্রথম আমরাই উঠেছিলাম, তবে আমি নেমে আসার পর দেখলাম আরও বেশ কয়েকজনই উঠেছেন, যেটা দেখে আমি একটু স্বস্তি পেলাম। কারন সম্পূর্ণ কম্পার্টমেন্টে শাশুড়ি মাকে একা একা জার্নি করতে দিতে আমার একটু ভয় লাগছিলো। কারন সুবিধা অসুবিধায় যদি পাশে দু একজন না থাকে, তাহলে বয়স্ক মানুষের জন্য একটু সমস্যার হয়।

যাইহোক ট্রেনে বসে ওনার আনন্দ দেখে আমার বেশ ভালো লাগছিলো। তাই চুপ করে একটা ছবিও তুললাম। ভয় যে উনিও পাচ্ছিলেন না এমনটা নয়, যেহেতু প্রথমবার একা এতোটা দূর যাচ্ছেন। তবে ভয়ের পাশাপাশি ওনার বেশ খারাপ লাগাও কাজ করছিলো। কথা প্রসঙ্গে বারবার উনি বলছিলেন জীবনে এই প্রথমবার শ্বশুরমশাইকে ছেড়ে উনি উনার শ্বশুরবাড়ির কোনৈ আত্মীয়ের বাড়িতে যাচ্ছেন।

IMG_20260724_114135.jpg
"প্রথমবার একা যাচ্ছিলেন তাই অল্প ভয় পেলেও, অনেকটা খুশি ছিলেন। তবে শ্বশুরমশাইকে ভীষণ মিস করছিলেন।"

তবে এই যাওয়াটাও জরুরী। বয়স বাড়ছে ধীরে ধীরে, এর পরবর্তীতে একেবারেই বেরোতে পারবেন না। তাই তার আগে একটু ঘুরে আসুক ভেবেই আর আপত্তি করিনি। বরং মনের জোর দিয়েই পাঠালাম।

আমি যে একেবারে টেনশন করছিলাম না এমনটা নয়। সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে, লাগেজ ঠিকঠাক জায়গায় রেখে দিয়ে, আমি ট্রেন থেকে নেমে দাঁড়ালাম। কারণ সময় হয়ে‌ এসেছিলো ট্রেন ছাড়ার।

ট্রেন ছাড়ার পর আমি ফোন করে দিয়েছিলাম শাশুড়ি মায়ের ননদের কাছে, জিনিস সম্পর্কে আমার পিসি শাশুড়ি নন বরং দিদা হন। এমনটা‌ হয়েছে সম্পর্কের জটিলতার কারণে।

যাইহোক দিদাকে ফোন করে জানালাম যে, শাশুড়ি মা রওনা হয়ে গেছে, যাতে নির্দিষ্ট সময়ে আমার মামা এসে ওনাকে স্টেশন থেকে নিয়ে যায়। এরপর আমি আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। কারন আমার ফেরার ট্রেন
প্রায় চল্লিশ মিনিট লেট ছিলো।

IMG_20260724_140946.jpg
"বাড়ি ফেরার পথে‌ হাঁটতে হাঁটতে ছবিটা তুলেছিলাম।"

যাইহোক আমার ট্রেন কোন প্লাটফর্মে দিয়েছে সেটা দেখে আমিও ট্রেনে এসে বসলাম। জানালার পাশে সিট নিয়ে, কানে হেডফোন দিয়ে, নিজের পছন্দের বেশ কিছু গান শুনতে শুনতে পৌঁছে গেলাম দত্তপুকুর স্টেশনে। আগামীকাল একাদশী রয়েছে, তাই আসার সময় একটু ফল কিনে নিয়ে এলাম আমার‌ আর শুভর জন্য।

তারপর বাড়িতে এসে বাকি সাংসারিক কাজকর্ম সেরে, স্নান করতে করতে বিকেল প্রায় চারটে এর কাছাকাছি বেজে গেলো।মাঝে বেশ কয়েকবার শাশুড়ি মাকে ফোন করে খবর নিয়েছি। ঠিক আছেন কিনা, কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা।

IMG_20260724_141047.jpg
"গলির মধ্যে এখনও আর্জেন্টিনার পতাকা গুলো টানানো রয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর সময় পাড়ার সকলে মিলে হয়তো লাগিয়েছিলো ।"

প্রায় সাড়ে চারটে নাগাদ তিনি ট্রেন থেকে নেমেছেন এবং ওনাকে নেওয়ার জন্য প্ল্যাটফর্মে মামা দাঁড়িয়েই ছিলো, ওনাকে সাথে করে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছে। বাড়িতে পৌঁছে তিনি যখন আমাকে ফোন করে জানালেন যে তিনি ঠিকভাবে পৌঁছেছেন, সত্যি কথা বলতে তখন একটু নিশ্চিত হলাম। যে অবশেষে তিনি এই জার্নিটা কমপ্লিট করতে পেরেছেন।

হয়তো অনেকটা বছর বাদে এসে একা একা যাত্রা করেছেন, তবে এর যে একটা আলাদা খুশি আছে সেটা নিশ্চয়ই তিনি অনুভব করেছেন। আর ওনার নিজের ভেতরের আত্মবিশ্বাস জেগেছে যে, ওনার একার পক্ষেও জার্নি করা সম্ভব। আমরা মেয়েরা আসলে বড্ড বেশি পরনির্ভরশীল হয়ে থাকি। পরিস্থিতি কঠিন না হলে আমরা কখনোই নিজের ভিতরে থাকা মনোবল সম্পর্কে জানতে পারি না।

IMG_20260724_192948.jpg
"আগামীকাল একাদশী আছে। তার জন্য একটু ফল কিনে নিয়ে এসেছিলাম ফেরার পথে।"

যাইহোক শাশুড়ি মায়ের নিশ্চয়ই ওখানে ভালো সময় কাটবে। কারণ কাছের মানুষদের সাথে সময় কাটানোর পাশাপাশি, গ্রামের দিকে থাকতে উনি বড্ড বেশি ভালোবাসেন। আর আমার দিদার বাড়িটা একেবারে গ্রাম্য পরিবেশে। তাই সেখানে থাকার এক আলাদা আনন্দ আছে।

আমার বিশ্বাস আজকের দিনটা আমার শাশুড়ি মায়ের জন্য বিশেষ হয়ে থাকবে। এতো বছর বয়সে এসে উনি যে আত্মবিশ্বাসের সহিত জার্নিটা করতে পেরেছেন, এটা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে পেরে আমার নিজের খুব ভালো লাগছে।

যাইহোক ভালো থাকবেন আপনারা সকলে। শুভ রাত্রি।

Sort:  
image.png
Curated By: lirvic
1000057660.png
Curated By : memamun
Loading...

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.33
JST 0.104
BTC 64279.30
ETH 1870.28
USDT 1.00
SBD 0.36