নিস্তব্ধতার আড়ালে!
ট্রান্সফারের কারণে সেবার পাহাড়ে থাকতে হয়েছিল দীর্ঘ তিন বছর!
ওখানের স্থানীয় একটি বয়স্ক মহিলার সাথে পরিচয় হয়েছিল, প্রতিদিন তার হোটেলে খেতে যেতাম! কাজের, কারণে খানিকটা আর ক্লান্তির কারণে এই ব্যবস্থা!
যে মহিলার কথা বলছি, তার দৈহিক গড়ন আর সাধারণ পাহাড়িদের মতোই,
গায়ের রঙ তামাটে, কপালে অভিজ্ঞতার ভাঁজ, উচ্চতা পাঁচ ফুট, পাহাড়ি পোশাক পরিহিতা, চোখ দুটি অক্ষী কোটরে ঢুকে গিয়েছে, কিন্তু দৃষ্টিতে বিচক্ষণতার ছাপ সুস্পস্ট! মহিলার নাম পেমা শেরপা!
আমার নাম ইন্দ্রানী, ভারতীয় ডাক বিভাগের কর্মচারী।
এখন ডিজিটালাইজেশনের যুগে সরকারের তরফ থেকে সব নথি কাগজের পরিবর্তে ডিজিটাল রেকর্ড করা থেকে শুরু করে বাকি কর্মরত কিছু অফিসার দের ট্রেনিং দেবার জন্য আমাকে এখানে পাঠানো হয়েছে।
সকাল থেকে কাজের চাপে রান্না করে ওঠা সম্ভব হয় না, তবে সবে তিন মাস হয়েছে, আর কিছুদিন গেলে বাড়িতে রান্না আর ঘরের কাজ করবার জন্য দুজন সহায়ক রেখে নেবো।
ততদিন স্থানীয় মানুষদের সাথে পরিচয়, নিজের লাগেজ গোছানো, অফিসের দায়িত্ব সামলে ছুটির দিনে, আশেপাশের কিছু মন্দির এবং দর্শনীয় স্থান লোকাল গাইডের সহায়তায় দেখব ঠিক করেছি।
রবিবার দুপুরে পেমা আন্টির হোটেলে খেতে গিয়েছিলাম, সেখানে দেখলাম একজন পুরুষকে উদ্দ্যেশ্য করে নিজের ভাষায় উত্তেজিত হয়ে পেমা আন্টি কিছু বলছে!
এই কয়েক মাসে তাকে এমন উত্তেজিত হতে কখনোই দেখিনি, তবে আমি যাবার সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম, আন্টি চুপ গিয়ে গেলো, আর বাকিরা যে যেদিক থেকে এসেছিল, সকলেই চলে গেলো।
বেশ অবাক হলাম! তারপর ভাবলাম, হয়তো পারিবারিক কোনো বিষয়, তাই বহিরাগত মানুষকে দেখে চুপ করে গেছেন!
আমি আমার মত খেয়ে ফিরে আসলাম! পরদিন অফিস কাজেই সকালে উঠে সমস্ত কাজ সেরে, আগের দিনের কেচে রাখা কিছু অর্ধেক ভেজা কাপড় চোপড় ঘরের দড়িতে মেলে দিয়ে অফিসের পথে রওনা হলাম।
অফিসে পৌঁছে দেখলাম, সকলেই কিছু আলোচনা করছে, এরপর একজনকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে জানলাম, আজকে সকালে একজন স্থানীয় পুরুষকে চন্দ্রতাল লেকের একশ মিটারের কাছাকাছি মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে!
লোকটিকে সকলেই চেনে; নাম লাকপা শেরপা!
এই পরিচিতির বিশেষ কারণ রয়েছে, এক্ জায়গাটি ছোট, (লাহাউল এবং স্পিতি জেলার অন্তর্ভুক্ত), আর দ্বিতীয় কারণ হলো, লকপা শেরপা ছিলেন, পেমা শেরপার ছোট বোন ডলমা শেরপার স্বামী!
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ডেড বডি ময়নাতদন্ত করতে নিয়ে গেছে, আর বাকি খবর পেলাম দুপুরে হোটেলে খেতে গিয়ে;
গতকাল অর্থাৎ রবিবার যে লোকটির সাথে পেমা আন্টির কথা কাটাকাটি হচ্ছিল, সেই ছিল, লাকপা শেরপা!
পুলিশ আন্টিকে থানায় তলব করেছে, তাই হোটেল বন্ধ! আন্টির জন্য খারাপ লাগা কাজ করছিল, তাই কিছু শুকনো খাবারের প্যাকেট কিনে অফিসের পথে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম।
আগামীকাল থেকে সাত দিনের ছুটি নেবো সিদ্ধান্ত নিলাম!
জানা নেই কতদিন ধরে এই হোটেল বন্ধ থাকবে!
তাই রান্নার ব্যবস্থার পাশাপশি, অন্য হোটেল এবং কাজের সহায়তা করবার জন্য লোক খুজতে খানিক সময় প্রয়োজন!
অফিসে কাজের ফাঁকে লাকপা শেরপা সম্পর্কে কিছু তথ্য জানতে পারলাম, লোকটিকে বিশেষ কেউ পছন্দ করত না, কারণ সারাদিন নেশা করে পড়ে থাকত, সেরকম কোনো কাজ করত না!
বাজারে অনেক ধার গিয়ে গিয়েছিল, পেমা আন্টি নিজের পাশাপশি বোনের সংসার খরচ চালায়, গতকাল টাকা চাইতে গিয়েছিল হোটেলে, আর সেই নিয়েই দুজনের বচসা!
কে খুন করলো লাকপা শেরপাকে?
জানতে লেখায় চোখ রাখুন!