পরিচয়!

in Incredible Indiayesterday

1000091768.jpg

প্রতিদিনের মত ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে, সকালের টিফিন তৈরি করে, সাতটায় বাজার যাওয়া, এরপর বাজার থেকে ফিরে সমস্ত বাজার গুছিয়ে,
তারপর বাড়ির জামাকাপড় পড়ে, এক কাপ চা নিয়ে পাঁচটা মিনিট বসে, মেয়েকে স্কুলের জন্য তৈরি করা!

আরে কাজের হিসেব দিতে গিয়ে নিজের নামটাই আপনাদের জানাতে ভুলে গিয়েছি!
আমার নাম কল্পনা! আমার বিয়ে হয়েছে দশ বছর।
বাড়িতে স্বামী, আমার একটি মেয়ে, যার নাম স্পৃহা। বয়স নয়, ক্লাস ফোরে পড়ছে, একটি স্থানীয় বাংলা মাধ্যম স্কুলে!

পরের বছর ক্লাস ফাইভে উঠলে আর এত সকালে স্কুল থাকবে না, তখন দশটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরোতে পারলেই, সঠিক সময়ে পৌছে যেতে পারবে স্কুলে।

রবিবার আমার স্বামী বাজারে যায়, কিন্তু সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে আমাকেই বাজার করতে হয়।

বিয়ের প্রথম দু'বছর ছাড় পেয়েছিলাম, তখন মেয়ে খুব ছোট ছিল!
এরপর শ্বাশুড়ি একদিন জানালেন, শ্বশুরের বয়স হয়েছে, সাথে উচ্চ রক্তচাপ, বাজারের রোদ্দুরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে!

আর তার ছেলে অর্থাৎ শুভঙ্কর (আমার স্বামী) কোনোদিন বাজার করে নি, তাই আমাকেই বাজার করতে হবে।

মনে মনে সেদিন ভেবেছিলাম, আমিও কোনোদিন বাজার করিনি, কথাটা স্বামীকে জানালেও বিশেষ কাজ হয়নি!

1000079173.jpg

সেদিন ঠিক হয়েছিল, রবিবার সে যাবে বাজারে, আর সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে আমাকেই বাজার করতে হবে।

শ্বাশুড়ির বাতের ব্যথার কারণে ঘরের কোনো কাজ করতে পারেন না।
মেয়ে যখন খুব ছোট, তখন ঘরের কাজের সময় উনি মেয়েকে রাখতেন তবে মন থেকে নয়!

ছেলে হয়নি বলে, অনেক তির্যক কথা আমাকে শুনতে হয়েছে, পরের দিকে দ্বিতীয় সন্তানের জন্য অনেক চেষ্টা করলেও আমার স্বামীর কিছু সমস্যার কারণে সেটি আর সম্ভব হয়নি, যেটা আজও আমি আর আমার স্বামী ব্যতীত কারোর জানা নেই!

তাই, সকলেই মনে করে, আমি দ্বিতীয় সন্তান ধারণে অক্ষম!
স্বামীর সম্মানের খাতিরে মেনে নিয়েছি বিষয়টি।

যদিও, আমার বিয়ে দেখাশোনা করে, আমার বাবার বাড়ি উত্তর পাড়ায়!
আমার জন্ম ঠিক বড় হওয়া সবটাই ওখানে।
কত করে বাবাকে বলেছিলাম, বিয়ের কথা পাকা করবার আগে যেনো ছেলের বাড়ি থেকে চাকরি করতে দেবে এমন অনুমতি নেয়!

বাবা বলেছিলেন ছেলে পক্ষের কোনো অসুবিধা নেই, আমি চাইলে বিয়ের পরে, তারা চাকরি করতে দেবেন।

এই একটাই দাবি ছিল আমার কিন্তু বাবা সেদিন আমায় মিথ্যে বলেছিলেন, সেটা বিয়ের রাতেই জানতে পেরেছিলাম।

এত কেঁদেছিলাম সেদিন! শুভঙ্কর ভেবেছিল বাবার বাড়ি থেকে নতুন বাড়িতে আসার কারণে সেই কান্না!

বিশ্বাস করুন, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি নিজের পরিচয় খুঁজে বেড়াচ্ছি!
বাবার উপর এতটাই অভিমান জমা হয়েছিল যে, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কোনোদিন কথা বলিনি!

আমার এই এক্ ব্যাধি, কারোর উপর অভিমান হলে, চুপ করে যাই!
নিজের সাথে অনেক কথা বললেও, তখন আর ইচ্ছে করে না কারোর সাথে কথা বলতে!

নিজের কাজগুলো করি কিন্তু বিনা বাক্যব্যয়ে!
আমার মেয়েকে ঘিরে আমার অনেক স্বপ্ন!
আমি কিছুতেই আমার বাবার মতো করে নিজের মেয়ের সাথে অন্যায় করবো না, আর কাউকে করতেও দেবো না!

এই তো বুধবার বাজার করছিলাম, পিছন থেকে পাড়ার একজন বয়স্ক মাসীমা আমায় দেখে বললো তুমি দাস বাড়ির বউ না?

1000075858.jpg

আমি বললাম হ্যাঁ মাসীমা! উনি নিজের পরিবারের অনেক সুখ দুঃখের কথা বলছিলেন বটে, তবে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম ওই দাস বাড়ির বউ শব্দটির ভিড়ে!

বিয়ের আগে আমি ছিলাম, কমল বাবুর মেয়ে, এরপর হলাম শুভঙ্করের বউ, আর কিছুজনের জন্য আমি দাস বাড়ির বউ!

আমি কে? কি আমার নিজের পরিচয়? বাবার একটা সিদ্ধান্ত আমার থেকে আমার পরিচয় কেড়ে নিয়েছিল! আর, সেই অভিমান আজও মনের সংগোপনে রেখে দিয়েছি!

আমার হারিয়ে যাওয়া পরিচয় কি এই জীবনে আর কোনোদিন খুঁজে পাবো? নাম যখন কল্পনা, তখন কল্পনা করতে দোষ কোথায়?

1000010907.gif

1000010906.gif

Sort:  
Loading...

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.33
JST 0.100
BTC 65541.47
ETH 1905.52
USDT 1.00
SBD 0.38