আধুনিক দাস
হাঁসফাঁস লাগছে হাসিবের। অথচ দিব্যি এসির শীতল হাওয়ার ভেতরেই দাঁড়িয়ে আছে সে। তবু গলার টাইটা যেন ভেতর থেকে ফাঁসির দড়ির মতোই তাকে চেপে ধরেছে। কর্পোরেটের চাকচিক্য, আলোঝলমলে মেকি হাসি আর মুখোশের উৎসব—কত দিনই-বা সহ্য করা যায়?
হাসিব তো যন্ত্রে গড়া কোনো রোবট নয়; সে রক্ত-মাংসের মানুষ। তাই কংক্রিটের খাঁচা আর কাচঘেরা বন্দিত্বকে উপেক্ষা করে বারবার ডানা ঝাপটে মুক্ত আকাশে উড়ে যেতে চায়।
স্যুট-বুট পরে সাহেব সাজার যে ক্ষীণ মোহ একদিন তাকে টেনেছিল, আজ সেই মোহকেই সে নিজ হাতে দাফন করতে চায়। নিয়মের শিকল হয়তো যন্ত্রের জন্য মানানসই, কিন্তু মানুষকে যন্ত্র বানিয়ে রাখার এই নরকীয় বিধান মানতে সে আর রাজি নয়। তাই মুক্তিই এখন তার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা।
ঘুণপোকা যেমন নিঃশব্দে কাঠকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়, কর্পোরেটও ঠিক তেমনই নিঃশব্দে ক্ষয় করেছে হাসিবকে। বাইরে থেকে সে এখনও সুগঠিত, পরিপাটি, সফল; অথচ ভেতরটা বহু আগেই ধসে পড়েছে। অবশিষ্ট আছে শুধু একটি সাজানো কাঠামো—প্রাণহীন, অনুভূতিহীন।
দায়িত্বের বেড়াজালে ঠিক কবে সে পিষ্ট হয়েছে, কিংবা কর্পোরেট নামের শোষকের ধারালো ছুরির নিচে কতবার নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা আর সত্তাকে বলি দিয়েছে—তার হিসাব সে নিজেও করে উঠতে পারেনি ।
কর্পোরেটের ঝলমলে মায়াজাল ছিন্ন করা সহজ নয়। কিন্তু আধুনিক দাস হয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে মরার চেয়ে স্যুট-বুট-টাই খুলে লুঙ্গি পরে মুক্ত বাতাসে হাঁটাও যে অনেক বেশি সম্মানের, অনেক বেশি শান্তির—সেই উপলব্ধিতে পৌঁছে গেছে হাসিব।
আচ্ছা, হাসিব যা পেরেছে, তা কি আপনি পারবেন? নাকি বেতন, পদবি আর কৃত্রিম সম্মানের বিনিময়ে আধুনিক দাসত্বকেই নিজের নিয়তি হিসাবে মেনে নেবেন?
শেষ বিকেলের হিমশীতল বাতাস, ডুবন্ত সূর্যের রক্তিম আলো, কাদামাটি-জল মেখে নীড়ে ফেরার আদিম আনন্দ—এসব আজ প্রাণভরে উপভোগ করছে হাসিব। মুক্তির স্বাদ সে পেয়ে গেছে। শুধু আপনি-ই এখনও অপেক্ষায় আছেন—নিজের অদৃশ্য শিকল ভাঙার।