হিমেল vs অনন্ত
বছর পনেরো আগের ঘটনা।
ভরদুপুরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে কলেজ ভবনের সপ্তম তলা থেকে ক্লাস শেষ করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিলাম। হঠাৎ করেই মুঠোফোনটা বেজে উঠল। কোনো রকমে পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখি—হিমেলের ফোন।
ফোন ধরতেই ও বলল, “বিকেলের দিকে বাইক নিয়ে গোবিন্দগঞ্জে যাব। তুই যাবি নাকি?”
গোবিন্দগঞ্জের নাম শুনলেই মনটা একটু নড়েচড়ে উঠত। তার ওপর তখন কলেজপড়ুয়া বয়স। তবু কেন জানি সেদিন প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।
শুধু বলেছিলাম, “বন্ধু, সারাদিন ক্লাস করে শরীরটা খুব ক্লান্ত। তা ছাড়া মাত্র দুই দিন আগে বাড়ি থেকে এসেছি। তুই ঘুরে আয়, পরে একদিন দুজনে একসঙ্গে যাব।”
এই বলে কোনো রকমে ফোনটা কেটে দিয়ে মেসে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
কিন্তু ঘুম ভাঙার পর যে খবরটি শুনেছিলাম, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। মনে হচ্ছিল যেন, মুহূর্তের মধ্যে মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে।
হিমেল সেদিন সত্যিই গোবিন্দগঞ্জে গিয়েছিল। তবে বগুড়ায় ফেরার পথে বাইক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল।
যদি ওর হাত-পা ভেঙে যেত, কিংবা আরও গুরুতর শারীরিক ক্ষতি হতো—তবু বন্ধু হিসেবে অন্তত নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম।
কিন্তু দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে তেমন লোকজন ছিল না। এমনকি ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেও অনেকটা সময় লেগে গিয়েছিল। ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই শেষ পর্যন্ত হিমেলের ভাগ্যে মৃত্যু জুটেছিল।
তখন তো ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এতটা সহজলভ্য ছিল না। তাই দুর্ঘটনার খবরও আমাদের কাছে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়েছিল।
এ দিক থেকে অনন্তর ভাগ্য কিছুটা হলেও ভালো। ওর বন্ধুরা, এলাকার মানুষ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসংখ্য মানুষ দ্রুত তৎপর হয়ে উঠেছিল। অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা, রক্ত সংগ্রহ, উন্নত চিকিৎসা—সবকিছুই ওর জন্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল।
এটা সত্য, ওর একটি পা হারাতে হয়েছে; কিন্তু তারপরেও ও আজ বেঁচে আছে। অথচ আমার বন্ধু হিমেলের ক্ষেত্রে এসবের কোনোটাই করার মতো সময় আমরা পাইনি।
দীর্ঘ পনেরো বছরের বেশি সময়ে দেশের অনেক কিছুই বদলে গেছে। প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে, মানুষের যোগাযোগ সহজ হয়েছে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা যেন কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না।
মাঝেমধ্যে মনে হয়, যদি গোবিন্দগঞ্জে একটি সরকারি ট্রমা সেন্টার থাকত, কিংবা গোবিন্দগঞ্জ ১০০ শয্যার আধুনিক সরকারি হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা সব সময় নিশ্চিত থাকত, তাহলে হয়তো ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার পরেও অনেক অকাল মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো।