"জীবনে কখন কার সাথে শেষ দেখা হয়, সত্যিই বোঝা কঠিন"
Hello,
Everyone,
আমি ভেবেছিলাম আজকের পোস্টের মাধ্যমে ওল্ড বাবা মন্দির ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করবো। কিন্তু আজ এমন একটা ঘটনার কথা শুনলাম যে, সেই বিষয়ে কিছু কথা শেয়ার করতে বড্ড ইচ্ছে হলো।
আপনারা জানেন আমার শাশুড়ি মা কিছুদিনের জন্য ওনার ননদের বাড়িতে বেড়াতে গেছেন। এদিকে আজ সোমবার তাই শুভরও অফিসে ছিলো। তাই সারাদিন বাড়িতে আমি একাই ছিলাম।
সংসারের সমস্ত কাজ শেষ করে দুপুর বেলায় স্নান সেরে, পূজো দিয়ে, টিভি চালিয়ে একা একা সবেমাত্র লাঞ্চ করতে বসেছি। এমন সময় হঠাৎ করে কলিং বেলের আওয়াজ শুনে বেশ অবাক হলাম। কারণ হঠাৎ করে দুপুর বেলায় কে আসবে এটাই ভাবছিলাম।
হাত ধুয়ে চাবি নিয়ে গেটের কাছে গিয়ে দেখি, আমাদের একজন আত্মীয় শাশুড়ি মায়ের সাথে দেখা করতে এসেছেন। উনি আসলে জানতেন না যে শাশুড়ি মা বাড়িতে নেই। সম্পর্কে তিনি আমার মাসি শাশুড়ি হন।
বেশ অনেকটাই বয়স হয়েছে ওনার। অনেক কষ্ট করে এসেছেন তিনি। যদিও বাড়ি খুব একটা দূরে নয়, তবে বার্ধক্যের কারণে অল্প দূরত্বও অনেক বেশি মনে হয়। উনি আমার শাশুড়ি মায়ের দিদি হন, ওনার সাথেই দেখা করতে এসেছিলেন।
তিনি মূলত একটা খবর নিয়েই এসেছিলো। ওনাদের বাড়ির পাশেই একজন মহিলা গতকাল মারা গেছেন। যিনি আমার শাশুড়ি মায়েরও বেশ পরিচিত। এমনকি আমাদের বাড়িতেও দুই তিনবার তিনি এসেছেন। তাই তার মুখটা যে আমার একেবারে মনে নেই, এমনটা নয়।
শাশুড়ি মায়ের কাছে শুনেছিলাম ওনার ক্যান্সার ধরা পড়েছে, ট্রিটমেন্টও চলছে। এমনকি ট্রিটমেন্ট চলাকালীনও আমাদের বাড়িতে তিনি একবার এসেছিলেন। আমার শ্বশুর মশাইয়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের পর, ৪৫ দিনে যে বৈষ্ণব সেবা হয়েছিলো সেদিন।
ওনাকে দেখে সেদিন খুব বেশি অসুস্থ মনে হয়েছিলো এমনটা নয়। সেই মানুষটাই যে আজ আর পৃথিবীতে নেই এটা জেনেই খারাপ লাগলো। সত্যি কথা বলতে সময়ের সাথে সাথে আমাদের সাথে যাদের পরিচয় হয়, তাদের মধ্যে কখন কার সাথে আমাদের শেষ দেখা হয়, সেটা আমরা কেউই বলতে পারি না।
তবে শুধু সেই সকল মানুষের ক্ষেত্রেই কথাটা প্রযোজ্য নয়। আমাদের আপনজনদের সাথেও যে কোন মুহূর্তটা আমাদের জন্য শেষ মুহূর্ত, তাও আমরা বুঝতে পারি না। কারণ মৃত্যু এতোটাই অতর্কিত ভাবে এসে ধরা দেয় যে, আগে থেকে তার আন্দাজ করতে পারা একেবারেই অসম্ভব।
মাসির কাছেই শুনলাম মাত্র ৯ দিন আগে ওনার ছেলের বিয়ে হয়েছে। ছেলের বউ দেখে যাওয়ার শখ তার বহুদিনের। কিন্তু কথায় আছে- জন্ম মৃত্যু বিয়ে তিন বিধাতা নিয়েস। তাই কখন কবে কার জন্ম হবে, কার কবে বিয়ে হবে, আর কবে তার মৃত্যু হবে এ কথা বোধহয় বিধাতা ছাড়া আর কেউই জানেন না।
অবশেষে ৯ দিন আগে ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। শরীর তখন অনেকটাই খারাপ ছিলো। তবে সংসারের দায়িত্ব বউয়ের কাঁধে দিয়ে হয়তো নিশ্চিন্তেই তিনি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। কথাটা শুনে খারাপ লাগাটা আরও অনেক বেশি বেড়ে গেলো।
আমাদের প্রত্যেকের জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা কতো কিছু পরিকল্পনা করি। উনিও নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন ছেলের বউ আসলে তার বাড়ি পরিপূর্ণ হবে। আরও অনেক গুলো দিন তিনি তার সাথে কাটাতে পারবেন। এমনকি একই প্রত্যাশা হয়তো ওনার ছেলেরও ছিলো।
বিয়ে আমাদের প্রত্যেকের জীবনের এক সুন্দর মুহূর্ত, সেটা নিয়ে আমাদের পরিকল্পনাও থাকে অনেক। তবে মায়ের অসুস্থতায় ছেলেটা হয়তো নিজের মতো করে বিয়েটাও উপভোগ করতে পারেনি। আর মাত্র কয়েক দিনের মাথায় মায়ের চলে যাওয়ার বিষয়টা ওদের জন্য কতখানি শোকের, আমরা সেটার আন্দাজও করতে পারছি না।
মাসি বারবার বলছিলো, কয়েকদিন আগে বিয়ের সাজে যাকে দেখলাম, আজ মায়ের মৃত্যুর পর যখন সাদা ধুতি পড়ে দেখলাম, কি যে খারাপ লাগছিলো। এই খারাপ লাগাটাই আমার শাশুড়ি মায়ের সাথে উনি শেয়ার করতে এসেছিলেন। তার পাশাপাশি বৈষ্ণব সেবা নিয়েও কিছু কথা বলতেন।
কারণ ওই বাড়িতে যতবারই বৈষ্ণব সেবা হয়েছে, সেখানে আমার শাশুড়ি মা, শ্বশুর মশাইকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। সকাল থেকে আমার শাশুড়ি মা, মাসি সকলে মিলেই সেই বাড়িতে রান্নাবান্নার আয়োজন করেন। তার সাথে ওই মহিলাও যোগ দিতেন। সবাই মিলে সুন্দরভাবে অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন করতেন। তাদের মধ্য থেকে একজন হঠাৎ করে এইভাবে চলে যাওয়ায় খারাপ লাগারই কথা।
ক্যান্সার এমন একটা রোগ, যেটা শুরুর দিকে ধরা পড়লে নির্মূল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ঠিকই। তবে একেবারে শেষের দিকে ধরা পড়লে সেখান থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার কোনো আশাই থাকে না।
ওই বাড়ির নতুন বউটার কথাও ভাবছিলাম। বিয়ের পর নতুন জীবনে প্রবেশের পরেই এতো বড় একটা দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়বে, এটা হয়তো ও ভাবেনি। সত্যি কথা বলতে বিয়ে একটা ছেলের জীবনে যতখানি পরিবর্তন আনে, তার থেকে অনেক বেশি পরিবর্তন আনে একটা মেয়ের জীবনে।
নিজের পরিচিত বাড়ি, নিজের ঘর, আপনজন সবাইকে ছেড়ে এসে নতুন একটা জায়গায় সকলের সাথে নতুন সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করে। এই বিষয়টা একটা মেয়ের জন্য যে কতখানি কঠিন সেটা হয়তো মেয়ে হিসেবেই আমি উপলব্ধি করতে পারছি।
আর সেখানে যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে তার অবস্থাটা আরও কতখানি খারাপ হতে পারে, সেটাই আমি আর মাসি আজ আলোচনা করছিলাম। যাইহোক এতোকিছু সত্ত্বেও জীবনের কোনো কিছুই আমাদের হাতে নেই। আমাদের জীবনটা ঈশ্বর যেভাবে সাজিয়েছেন, ঠিক সেইভাবেই চলবে।
তাই কোনো ঘটনাকে বদলানোর ক্ষমতা আমাদের নেই, হয়তো সময়ের সাথে সাথে এই মেয়েটিও এই সংসারের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে নিজেই নিয়ে নেবে। কারণ একথা সত্যিই, আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, একজন মহিলা ছাড়া ইট, কাঠ, পাথর দিয়ে তৈরি করা ইমারত কখনো বাড়ি হয়ে উঠতে পারে না।
যাইহোক যেহেতু ওই মহিলাকে চিনতাম তাই কোথাও না কোথাও তার চলে যাওয়াতে মনটা একটু হলেও ভারাক্রান্ত হয়েছে। তবে শারীরিকভাবে যে কষ্ট উনি পাচ্ছিলেন, সেটা আমাদের কারোর পক্ষে নেওয়া সম্ভব হতো না।
তাই হয়তো তার চলে যাওয়াটা তার জন্যই শ্রেয় হয়েছে। যাইহোক প্রার্থনা করি ঈশ্বর ওনাকে স্বর্গবাসী করুন। পাশাপাশি সকলের প্রিয়জন যেন ভালো থাকে, সেই কামনাও রইলো।
শুভরাত্রি।